জয়নাল আবেদীন রিটন, ভৈরব প্রতিনিধি ॥
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ছিনতাইকারীর কবল থেকে রক্ষা পেতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় সজল মিয়া (২০) নামে এক তরুণ মোটরসাইকেল আরোহীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা আরও দুই কিশোর গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের একজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আদর্শপাড়া ও বাঁশগাড়ী সংযোগ ব্রিজের সামনের সড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত সজল মিয়া উপজেলার শিমুলকান্দি ইউনিয়নের গোছামারা গ্রামের মধ্যের বাড়ির বাসিন্দা চাঁন মিয়ার ছেলে। তিনি পেশায় একজন মোটরসাইকেল চালক ছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাতে সজল মিয়া তার চাচাতো ভাই জোনায়েদ মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের কুমিরমারা গ্রামে তার ফুফার বাড়িতে যান। সেখানে যাওয়ার পর তিনি ফুফা কাসেম মিয়ার মোটরসাইকেল নিয়ে ফুফাতো ভাই রামিমকে সঙ্গে করে তিনজন একসঙ্গে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
ফেরার পথে রাত ১০টার দিকে আদর্শপাড়া ও বাঁশগাড়ী সংযোগ ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের থামানোর চেষ্টা করে। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় সজল মিয়া দ্রুত মোটরসাইকেলের গতি বাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
এ সময় অতিরিক্ত গতির কারণে মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং রাস্তার পাশের একটি গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। সংঘর্ষের পর তিনজনই মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে যান।
ঘটনাস্থলে আহত, হাসপাতালে মৃত্যু
দুর্ঘটনার পর সজল মিয়া ও রামিম গুরুতর আহত হন। অপর আরোহী জোনায়েদ তুলনামূলকভাবে কম আহত হন এবং দ্রুত স্থানীয়দের সহায়তায় চিৎকার শুরু করেন। তার ডাক শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আহতদের উদ্ধার করে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক সজল মিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত রামিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)-এ পাঠানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত জোনায়েদ মিয়া বলেন,
“আমরা বাড়ি ফেরার সময় ব্রিজের সামনে কয়েকজন লোক আমাদের থামানোর ইশারা দেয়। বিষয়টা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় সজল ভাই গতি বাড়ান। কিন্তু দ্রুত চালাতে গিয়ে মোটরসাইকেল কন্ট্রোল করতে না পেরে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। আমরা তিনজনই ছিটকে পড়ে যাই। সজল ভাই ও রামিম ভাই গুরুতর আহত হন।”
তিনি আরও বলেন, “আমি তেমন আহত না হওয়ায় দ্রুত চিৎকার করি। স্থানীয় লোকজন এসে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে জানতে পারি সজল ভাই আর বেঁচে নেই।”
পরিবারের শোক ও বক্তব্য
নিহতের চাচাতো ভাই মাহবুব ব্যাপারী জানান, শুক্রবার সকালে সজল মিয়া পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তালের রস খেতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সে উদ্দেশ্যেই তিনি ফুফার বাড়ি থেকে মোটরসাইকেল ও ফুফাতো ভাইকে আনতে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, “সজল একজন দক্ষ মোটরসাইকেল চালক ছিল। পরিবারের বড় ভরসা ছিল সে। তার একটি ভাই ও একটি বোন রয়েছে। হঠাৎ এমন মৃত্যু আমাদের পরিবারকে ভেঙে দিয়েছে।”
চিকিৎসকের বক্তব্য
ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার কৌশিক পাল জানান,
“সজল মিয়াকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। অপর আহত রামিমের শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যাওয়ায় তাকে ঢাকায় রেফার করা হয়েছে। বিষয়টি জানার পর থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়।”
পুলিশের অবস্থান
ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ বলেন,
“খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে যায়। প্রাথমিকভাবে ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে এটি একটি সড়ক দুর্ঘটনা। নিহতের পরিবার মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে গেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান।”
এলাকায় আতঙ্ক
এ ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওই সড়কে রাতে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিয়মিত টহল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
Post a Comment