জয়নাল আবেদীন রিটন, ভৈরব প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের ভৈরবের মেঘনা নদীতে প্রতিদিন বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ ও অননুমোদিত ফ্লোটিং পাম্পের সংখ্যা। ভাসমান নৌকায় করে জ্বালানি তেল বিক্রির এই অবৈধ ব্যবসা একদিকে যেমন সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতির কারণ হচ্ছে, অন্যদিকে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া চালানো এসব পাম্প নিয়ে এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। তবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে ভৈরব নৌ থানা ও বিআইডব্লিউটিএ।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, ভৈরবের যমুনা ও পদ্মা অয়েল কোম্পানি এলাকায় প্রতিদিন অন্তত ৮–৯টি ভাসমান পাম্প নৌকা ৪ থেকে ৫ লাখ লিটার খোলা জ্বালানি তেল তুলে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর ও নরসিংদীর রায়পুরাসহ আশপাশের বিভিন্ন হাটবাজারে সরবরাহ করে। অথচ এসব পাম্পের নেই কোনো তেল কোম্পানির অনুমোদন, নেই বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র কিংবা নৌ মন্ত্রণালয় কিংবা বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন। শুধুমাত্র ‘রূপসি বাংলা’ নামে একটি নৌকার অনুমোদন রয়েছে বলে জানা গেছে, বাকিগুলো পুরোপুরি অবৈধ।
যেহেতু এসব নৌকায় তেল পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, তাই অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। সাধারণত স্টিল বডির নৌকার ওপর লোহার ছাদ বসিয়ে পাইপ লাইন তৈরি করে মিটার বসানো পাম্পের মাধ্যমে তেল সরবরাহ করা হয়। খোলা তেল বহনের সময় সামান্য স্ফুলিঙ্গও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয় মাঝিদের বক্তব্যেও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় এই অনিয়মের মাত্রা সম্পর্কে। তিন বছর ধরে একটি ফ্লোটিং পাম্প চালানো মাঝি ওয়ালী উল্লাহ বলেন, “আমার নৌকার কোনো বৈধ কাগজপত্র নাই। আগে খোলা নৌকা ছিল, পরে টাংকি লাগিয়ে তেল পরিবহন করি। ভৈরব থেকে নবীনগর পর্যন্ত তেল বিক্রি করি।”
তবে আরেক মাঝি ইকবাল দাবি করেন, তার নৌকার সব কাগজপত্র মালিকের কাছে রয়েছে। মাঝি তানভির জানান, তাদের নৌকার মালিক বিআইডব্লিউটিএর কাছে অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছেন। গত এক বছর ধরে তারা জ্বালানি তেল পরিবহন করছেন।
ডিপো ঘাট এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিদিন রাতে–ভোরে ছোট ছোট নৌকায় জ্বালানি তেল লোডিং–আনলোডিং করা হয়। এসব নৌকায় নেই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, নিরাপত্তা পোশাক কিংবা তেল ব্যবস্থাপনার কোনো প্রশিক্ষিত কর্মী। ফলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত অভিযান না চালালে এটি বড় ধরনের বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
ভৈরব নৌ থানার অফিসার ইনচার্জ রাসেদুজ্জামান বলেন, “যমুনা ও পদ্মা অয়েলের ঘাট থেকে কয়েকটি ফ্লোটিং পাম্প বহুদিন ধরে অবৈধভাবে তেল পরিবহন করছে। বিআইডব্লিউটিএকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় খুব দ্রুত এসব পাম্পের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
একই কথা জানান বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা মো. শাহ আলম মিয়া। তিনি বলেন, “ভৈরব থেকে নিকলী, বাজিতপুর এবং নবীনগর পর্যন্ত ৮–৯টি ফ্লোটিং পাম্প চলছে। এর মধ্যে মাত্র একটি বৈধ, বাকি সবই অবৈধ। খুব শিগগিরই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মত, এসব অবৈধ ফ্লোটিং পাম্প বন্ধ করা গেলে শুধু সরকারের রাজস্ব বাড়বে না, পাশাপাশি খোলা তেল পরিবহনের মাধ্যমে যেসব দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তাও কমে আসবে। অন্যথায় ভৈরবের মেঘনা নদী একসময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের সাক্ষী হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
Post a Comment