ভৈরবে জলাবদ্ধতায় তলিয়ে হাজারো বিঘা ফসলি জমি

জয়নাল আবেদীন রিটন, ভৈরব প্রতিনিধি ॥
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার লক্ষ্মীপুর ও সম্ভুপুর গ্রামজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম জলাবদ্ধতা। কয়েক মাস ধরে জমে থাকা পানিতে তলিয়ে আছে হাজারো বিঘা আবাদি জমি। ফলে রবি মৌসুমের চাষাবাদ বন্ধ হয়ে গেছে। ফসল ফলাতে না পেরে কৃষকরা হতাশা ও দুঃসময় পার করছেন। একই সঙ্গে বাড়িঘরের উঠোন ও রান্নাঘর পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকায় গৃহিণীদের ভোগান্তিরও শেষ নেই। শিক্ষার্থীরাও দীর্ঘদিন ধরে পানিবন্দি থাকায় লেখাপড়ায় পড়ছে মারাত্মক ব্যাঘাত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এলাকার প্রধান নালাগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। এর ফলে বিল, ফসলের জমি ও বসতভিটা পানিতে নিমজ্জিত অবস্থায় আছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে গ্রামের মানুষ এখন উপজেলা প্রশাসনের আশু পদক্ষেপ কামনা করছে।

লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক কামাল মিয়া বলেন, “বর্ষা এলেই আমাদের এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। শুকনো মৌসুমেও পানি নামেনা। গত দুই বছর ধরে কোনো ফসল তুলতে পারিনি। এবারও রবি মৌসুমে জমিতে কাজ করা সম্ভব হবে না।” তিনি জানান, ইতোমধ্যে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে সম্ভুপুর গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম জানান, “আমাদের এলাকার ব্রিজের মুখগুলো পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পানি কোথাও যেতে পারছে না। একসময় এই জমিগুলো তিন ফসলি ছিল, এখন বছরে একটাও ফসল হয় না। আমাদের জীবিকা এখন হুমকির মুখে।”

স্থানীয় বাসিন্দা মজনু মিয়া বলেন, “বিগত কয়েক বছর ধরে জমে থাকা পানিতে হাঁটাচলা করতে গিয়েও নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। প্রায় দুই শতাধিক বিঘা জমিতে কেউ ফসল করতে পারছে না। খালের মুখ বন্ধ থাকায় পানি নামার কোনো পথ নেই।”

আরেক ভুক্তভোগী সোনা মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি খাস জমির পাশে কিছু জমি কিনে খালের মুখ বন্ধ করে রেখেছে। এর ফলে পুরো এলাকায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তিন মৌসুমে ফসল না হওয়ায় আমাদের সংসারে এখন চরম অভাব।”

জলাবদ্ধতার কারণে শুধু কৃষিই নয়, ব্যাহত হচ্ছে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যও। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় দেখা দিয়েছে সংকট। লক্ষ্মীপুর এলাকার গৃহিণী রোকসানা বেগম বলেন, “ঘরে পানি ওঠায় আমরা রান্না করতে পারি না। বাধ্য হয়ে ঘরের মেঝেতে চুলা বসিয়ে রান্না করি। রান্নাঘর, গোসলখানা—সব জায়গায় পানি। এই নোংরা পানিতেই গোসল করতে হয়।”

অন্য গৃহিণী হালিমা খাতুন বলেন, “চার মাস ধরে আমাদের ঘরে পানি। বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না, বই-খাতা ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। বন্যা না হলেও আমরা বছরের প্রায় অর্ধেক সময় পানিবন্দি জীবন কাটাই।”

শিক্ষার্থীদের অবস্থাও শোচনীয়। ভৈরব আসমত কলেজের শিক্ষার্থী বর্ণ বলেন, “কিছু লোক পানি যাওয়ার মুখ বন্ধ করে ফেলেছে। বৃষ্টির মৌসুমে এখানে বুক সমান পানি জমে থাকে। স্কুলে যেতে গেলে জামা-কাপড় ভিজে যায়। ফলে নিয়মিত ক্লাস করা সম্ভব হয় না।”

এদিকে, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রশাসনের হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ইতোমধ্যে লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক কামাল মিয়া ও সম্ভুপুর গ্রামের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিন বলেন, “এলাকাবাসীর অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি নালার মুখ ভরাট করে দিয়েছে, যার ফলে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নিয়ে পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে যাতে কৃষকরা পুনরায় জমিতে চাষাবাদ শুরু করতে পারেন।”

স্থানীয় কৃষক সমাজ বলছে, জলাবদ্ধতা শুধু কৃষকের ক্ষতি করছে না, এটি এখন পুরো এলাকার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আসন্ন রবি মৌসুমেও বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post