জয়নাল আবেদীন রিটন, ভৈরব প্রতিনিধি ॥
ভৈরবকে জেলা ঘোষণার দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে রেলপথে সংঘটিত এক সহিংস ঘটনায়। সোমবার (২৭ অক্টোবর) সকালে কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলওয়ে জংশনে উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় রেলওয়ের পক্ষ থেকে অজ্ঞাত ১৫০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে রেলওয়ে ডিবি ও জিআরপি পুলিশের যৌথ অভিযানে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রেলওয়ে সূত্রে ঘটনার বিবরণ
জেলা বাস্তবায়ন এক্য মঞ্চের আহ্বানে সোমবার সকালে ভৈরব শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষ ‘ভৈরবকে ৬৫তম জেলা ঘোষণা’র দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নেয়। সকাল ১০টার দিকে তারা ভৈরব রেলওয়ে জংশনে অবস্থান নিয়ে রেলপথ অবরোধ করে। এ সময় নোয়াখালী থেকে ঢাকাগামী উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনটি স্টেশনে আটকা পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরোধ চলার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ট্রেনটি চালু করার চেষ্টা করলে উত্তেজিত কিছু বিক্ষোভকারী ট্রেনের দিকে ইট-পাথর নিক্ষেপ করে। এতে ট্রেনের কয়েকটি জানালার কাচ ও ইঞ্জিনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও ঘটনাস্থলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের মামলা
এই ঘটনায় ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশনমাস্টার মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বাদী হয়ে ভৈরব রেলওয়ে থানায় অজ্ঞাত ১৫০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। তিনি জানান, “আন্দোলনকারীরা ট্রেনে পাথর ছুড়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করেছে। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমি এই মামলাটি দায়ের করেছি। ঘটনায় তিনজনকে পুলিশ ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে।”
রেলওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। পরে পৌর এলাকার পঞ্চবটি বউবাজার থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের নাম ফাহিম, আরমান ও সাধন নন্দী।
পুলিশের বক্তব্য
ভৈরব রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাঈদ আহমেদ বলেন, “ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করে রেলওয়ের রাষ্ট্রীয় সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এজন্য স্টেশনমাস্টার বাদী হয়ে অজ্ঞাত দেড়শ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। মামলার পরপরই যৌথ অভিযানে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের শনাক্তে অভিযান চলছে।”
তিনি আরও বলেন, “ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা হবে। কেউই আইনের বাইরে নয়।”
আন্দোলনের পটভূমি
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী কিশোরগঞ্জ জেলাকে ময়মনসিংহ বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করার খবরে গত ১১ অক্টোবর থেকে ভৈরবে শুরু হয় লাগাতার আন্দোলন। স্থানীয়রা দাবি তুলেছেন — ভৈরবকে আলাদা জেলা হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে।
প্রথমে মানববন্ধন, সমাবেশ ও শান্তিপূর্ণ মিছিলের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি চললেও, পরবর্তীতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গত ২৬ অক্টোবর সড়ক অবরোধ, ২৭ অক্টোবর রেলপথ অবরোধ এবং ২৮ অক্টোবর নৌপথ অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করে ভৈরব জেলা বাস্তবায়ন এক্য মঞ্চ।
সোমবারের রেলপথ অবরোধ কর্মসূচিতেই ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনাটি ঘটে।
জনমনে প্রতিক্রিয়া
রেলপথে এমন ঘটনা ঘটায় সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। যাত্রী আনোয়ার হোসেন, যিনি উপকূল এক্সপ্রেসে করে ঢাকা যাচ্ছিলেন, বলেন, “জেলার দাবি ন্যায়সঙ্গত, কিন্তু এইভাবে ট্রেনে পাথর ছোড়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এতে নিরীহ যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।”
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের একাংশ দাবি করেছে, প্রকৃত আন্দোলনকারীরা নয়, একটি দুষ্কৃতকারী গোষ্ঠী ইচ্ছে করে ট্রেনে পাথর ছুড়েছে আন্দোলনের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে লিখেছেন, “ভৈরববাসীর জেলার দাবি যৌক্তিক, তবে এমন সহিংসতা আন্দোলনের মর্যাদা নষ্ট করছে।” আবার কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, “সরকার দ্রুত দাবি মেনে না নিলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বাড়তেই থাকবে।”
চলমান অভিযান ও পরবর্তী কর্মসূচি
রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিওচিত্র ও স্থিরচিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্তের কাজ চলছে। যারা ট্রেন বা সরকারি সম্পদ নষ্ট করেছে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে আন্দোলনকারীরা আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) নৌপথ অবরোধ কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন ধাপে যাচ্ছে ভৈরববাসীর আন্দোলন। তারা জানিয়েছেন, “ভৈরব জেলা ঘোষণার সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত আমরা পিছু হটব না।”
Post a Comment