জয়নাল আবেদীন রিটন, ভৈরব প্রতিনিধি ॥
ভৈরব এখন জেলায় পরিণত করার দাবিতে উত্তাল। একের পর এক কর্মসূচিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে সারাব্যাপী। সড়কপথ অবরোধের পর আজ সোমবার (২৭ অক্টোবর) রেলপথ অবরোধে নেমেছেন স্থানীয় জনতা। এতে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় প্রায় দেড় ঘণ্টারও বেশি সময়।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ভৈরব রেলস্টেশনে নোয়াখালী থেকে ঢাকাগামী উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনটি লাল পতাকা টানিয়ে থামিয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা। তারা ভৈরবকে জেলা ঘোষণা না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। প্রায় ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট অবরোধ চলার পর ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, এতে বিপাকে পড়েন হাজারো যাত্রী।
যাত্রীদের দুর্ভোগ বিবেচনা করে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও রেলওয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এগিয়ে এলে উত্তেজিত বিক্ষোভকারীরা তাদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে। এতে ট্রেনের জানালার কাচ ভেঙে যায় এবং অন্তত পাঁচজন আহত হন। আহতদের মধ্যে আশুগঞ্জের যাত্রী জাহাঙ্গীর আলম (৪৫) নামের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
ট্রেন চলাচল ব্যাহত, পাঁচ ট্রেনের সময়সূচি বিপর্যয়
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, রেলপথ অবরোধের কারণে কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ভৈরবেই আটকে যায়। এছাড়া ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী কন্টেইনার ট্রেন থামে নরসিংদীর দৌলতকান্দিতে, তিতাস ট্রেন মেথিকান্দায়, কর্ণফুলী ট্রেন খানাবাড়িতে এবং চট্টলা ট্রেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তালশহর স্টেশনে আটকে থাকে। এসব ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
অনেক যাত্রী বিদেশগামী বা চিকিৎসা নিতে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। তারা জানান, সময়মতো গন্তব্যে না পৌঁছাতে পারলে তাদের মারাত্মক ক্ষতি হবে। যদিও কেউ কেউ স্বীকার করেন, “জেলার দাবিতে মানুষের আন্দোলন যৌক্তিক, কিন্তু এর জন্য নিরীহ যাত্রীদের ভোগান্তি হওয়া উচিত নয়।”
আন্দোলনের পটভূমি ও দাবির মূল বিষয়
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংস্কার কমিশনের এক প্রস্তাবে কিশোরগঞ্জ জেলাকে ময়মনসিংহ বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর থেকেই ভৈরববাসীর মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ১১ অক্টোবর থেকে শুরু হয় ধারাবাহিক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি—মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সমাবেশ ও অবরোধ।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সত্ত্বেও কোনো ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে ২৬ অক্টোবর সড়কপথ, ২৭ অক্টোবর রেলপথ ও ২৮ অক্টোবর নদীপথ অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করে আন্দোলনকারীরা।
ভৈরব বিএনপি, জামায়াতে ইসলাম, ছাত্রশিবির, গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা এই আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন।
নেতৃবৃন্দের বক্তব্য
ভৈরব উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুল ইসলাম, পৌর বিএনপির সভাপতি হাজী মো. শাহিন, ছাত্রনেতা মোহাম্মদ জাহিদুল, মাওলানা শাহরিয়ার, গোলাম মহিউদ্দিনসহ আরও অনেকে অবরোধ কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন।
তারা বলেন, “১৫ দিন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের পরও সরকারের টনক নড়েনি। এখন জনগণের সহনশীলতার সীমা শেষ। সরকার যদি ভৈরবকে জেলা ঘোষণা না করে, তাহলে সড়ক, রেল ও নৌ—সব পথই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হবে।”
পাথর নিক্ষেপে দায় অস্বীকার আন্দোলনকারীদের
পাথর নিক্ষেপের ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ দাবি করে ছাত্রনেতা শাহরিয়ার বলেন, “আমাদের আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ছিল। জনদুর্ভোগ এড়াতে আমরা দ্রুত ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু কিছু দুষ্কৃতকারী আন্দোলনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে ইচ্ছাকৃতভাবে এ হামলা চালিয়েছে।”
রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ সাইদ আহমেদ জানান, “আমরা স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করেছি। পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় তদন্ত চলছে। দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।”
তবে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশনমাস্টার মোহাম্মদ আবু ইউসুফ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকে জেলার দাবির প্রতি সমর্থন জানালেও ট্রেন থামিয়ে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানান। অনেকে মন্তব্য করেছেন, “ন্যায্য দাবির আন্দোলন হোক, কিন্তু তা যেন কখনো সাধারণ মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়।”
এদিকে আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দিয়েছেন, মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) নৌপথ অবরোধের মধ্য দিয়ে তারা নতুন ধাপের কর্মসূচি শুরু করবেন। তারা দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়েছেন, “ভৈরবকে জেলা ঘোষণা না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবেই।”
Post a Comment