জয়নাল আবেদীন রিটন, ভৈরব প্রতিনিধি ॥
ব্যস্ত নগরজীবনের একঘেয়েমি আর যান্ত্রিক শব্দের ভিড়ে হঠাৎ যেন প্রকৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন। সন্ধ্যা নামলেই হাজারো চড়ুই পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলওয়ে জংশন স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্ম এলাকা। ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের কোলাহল আর ব্যস্ততার মাঝেও প্রকৃতি এখানে যেন নিজস্ব ভাষায় কথা বলে—পাখির ডানার ঝাপটানি আর আনন্দময় কলতানে।
স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের এক পাশে অবস্থিত একটি কাঁঠাল গাছকে ঘিরেই এই অপূর্ব দৃশ্যের জন্ম। সন্ধ্যার একটু আগ থেকেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ুই পাখি উড়ে এসে জড়ো হতে থাকে এই গাছটিতে। কেউ বসে পাতার ফাঁকে, কেউ আবার গাছের ডাল ছেড়ে স্টেশনের উপর দিয়ে টানা বৈদ্যুতিক তারে সাময়িক আশ্রয় নেয়। কিছুক্ষণ পর তারাও ফিরে আসে গাছের ডালে বসে থাকা সঙ্গীদের কাছে। এরপর শুরু হয় দলবদ্ধ কোলাহল—কিচিরমিচির শব্দ, ডাল থেকে ডালে লাফালাফি আর ডানার মৃদু ঝাপটানিতে পুরো এলাকা যেন প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে।
এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই থমকে দাঁড়ান অসংখ্য ট্রেনযাত্রী ও স্থানীয় মানুষ। অনেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাদের মোবাইল ফোনে ভিডিও ও ছবি ধারণে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই এই প্রাকৃতিক দৃশ্যকে স্মৃতিতে ধরে রাখতে চান। কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভ বা ভিডিও আপলোড করে মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিচ্ছেন বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে।
স্থানীয়রা জানান, স্টেশনের আশরাফুল ইসলামের চায়ের দোকানের ঠিক ওপরেই থাকা এই কাঁঠাল গাছটি গত আট থেকে দশ বছর ধরে হাজারো চড়ুই পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই পাখিরা এখানে ফিরে আসে। রাত ঘনিয়ে এলে ধীরে ধীরে কোলাহল কমে আসে, নেমে আসে এক ধরনের নীরবতা। আবার ভোর হতেই দল বেঁধে তারা উড়ে যায় খাদ্যের সন্ধানে। সন্ধ্যা হলেই আবার ফিরে আসে আপন নীড়ে—এটাই যেন তাদের প্রতিদিনের রুটিন।
অনেকেই মনে করেন, এ ধরনের দৃশ্য সাধারণত গ্রামাঞ্চল কিংবা বনভূমিতে দেখা গেলেও জনবহুল একটি রেলস্টেশনে এমন পাখির অভয়াশ্রম সত্যিই বিরল। ব্যস্ত স্টেশনের মাঝেও প্রকৃতি যে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে, ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
স্থানীয় বাসিন্দা নয়ন মিয়া বলেন, “আমরা প্রতিদিনই এই দৃশ্য দেখি। কিন্তু দেখলেও মন ভরে না। সবচেয়ে ভালো লাগে যখন দেখি দূরদূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, মোবাইলে ছবি ভিডিও তোলে। তখন বুঝি প্রকৃতির এই সৌন্দর্য সবার মন ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে গাছ লাগানোর বিকল্প নেই।”
ঢাকা থেকে আসা ট্রেনযাত্রী মাসুদুর রহমান বলেন, “ঢাকায় সাধারণত এমন দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ে না। এখানে এসে পাখিদের কোলাহল দেখে মনটা একদম অন্যরকম হয়ে গেল। মনে হলো কিছু সময়ের জন্য হলেও শহরের কোলাহল ভুলে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে গেছি।”
স্টেশনের লেবার সর্দার হানিফ জানান, “গত আট-দশ বছর ধরে প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই হাজারো চড়ুই পাখি এখানে এসে বসে। তাদের ডানার শব্দ আর কিচিরমিচিরে পুরো স্টেশন এলাকা অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করে। অনেক যাত্রী ট্রেন থেকে নেমেই দাঁড়িয়ে যায়, মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে।”
চা দোকানের মালিক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “আমার দোকানের ওপরের কাঁঠাল গাছটিই এখন এই পাখিদের ঠিকানা। কয়েক বছর ধরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় তারা এখানে আসে। যত দিন যাচ্ছে, পাখির সংখ্যাও যেন বাড়ছে। এই দৃশ্য না দেখলে বোঝানো যাবে না—প্রকৃতি আসলে কতটা সুন্দর।”
পরিবেশ সচেতনরা মনে করছেন, নগরায়ণের চাপে যখন পাখির সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে, তখন ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের এই কাঁঠাল গাছ প্রকৃতির এক আশার বার্তা। তারা বলেন, গাছ সংরক্ষণ ও নতুন করে বৃক্ষরোপণ করা হলে এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আরও বিস্তৃত হবে।
ব্যস্ত রেলস্টেশনের কোলাহলের মাঝেও প্রতিদিন সন্ধ্যায় হাজারো চড়ুই পাখির কিচিরমিচির যেন প্রকৃতির নীরব বার্তা—মানুষ আর প্রকৃতির সহাবস্থান এখনও সম্ভব, যদি আমরা একটু যত্নশীল হই।
Post a Comment