স্বেচ্ছাসেবী অঙ্গনে অসুস্থ প্রতিযোগিতা: উদ্বেগ জানালেন স্বপ্নছোঁয়া পরিবারের সাধারণ সম্পাদক

কিশোরগঞ্জের সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বপ্নছোঁয়া পরিবার-এর সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক স্বেচ্ছাসেবী অঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁর ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন—মানবসেবার জায়গাটিতে এখন নেমে এসেছে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা, যেখানে সেবার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে প্রচারণা আর ব্যক্তিগত পরিচিতি।

তিনি লেখেন, “আজকাল মনে হয় স্বেচ্ছাসেবী অঙ্গনটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। একসময় মানুষ মানবতার টানে রক্ত দিত, মানুষের পাশে দাঁড়াত কেবল সাহায্যের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এখন যেন অনেকের মূল লক্ষ্য বদলে গেছে মানবসেবা নয়, বরং নিজের নাম, পরিচিতি আর প্রশংসা পাওয়া।”

তার ভাষ্য মতে, এখন প্রতি মাসেই এক ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা যায়—কে কতজন ডোনার সংগ্রহ করলো, কার নাম সর্বোচ্চ তালিকায় উঠে এলো কিংবা কে সংগঠনের অফিসিয়াল পোস্টে জায়গা পেলো ইত্যাদি। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “রক্তদান কোনো সংখ্যার খেলা নয়। এটা এক মানবিক দায়িত্ব। একজন মানুষের জীবন বাঁচানো এর মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এখন অনেকেই সেই উদ্দেশ্য থেকে সরে এসে নিজেদের সামনে আনার চেষ্টা করছে।”

তিনি ফেসবুক পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, “কোনো ছোটখাটো ভুল বা অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য একজন নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবীর মাসের পর মাসের শ্রম, ভালোবাসা আর অবদান ভুলে যাওয়া হয়। সবকিছুই যেন এখন সংখ্যায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা আমাদের স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব ফেলছে এবং এর অবসান না হলে ভবিষ্যতে প্রকৃত স্বেচ্ছাসেবী খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।”

‘সংখ্যা নয়, মানবিকতা’র বার্তা

আবু বকর সিদ্দিক তাঁর মতামতে জানান, প্রতিটি সংগঠনের উচিত এ বিষয়ে গভীরভাবে ভাবা। “সর্বোচ্চ ডোনার ম্যানেজকারী তালিকা প্রকাশ করা আসলে মানবিকতা বৃদ্ধি করে না; বরং তা অসুস্থ প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়,” তিনি মন্তব্য করেন। এ ধরনের তালিকা প্রকাশের সংস্কৃতি না থাকলে হয়তো আরও বেশি লোক স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত হবে। কিন্তু যখন দেখা যায় কেউ কতোটা প্রকাশিত হচ্ছে, বা কার নাম কোথায় উঠছে—তখন সেখানে সেবা নয়, বরং আত্মপ্রচারণাই বেশি গুরুত্ব পায়।

তিনি আরও বলেন, “মানবিক কাজ তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেটা হয় নিঃস্বার্থভাবে, নিঃশব্দে, শুধু মানুষের কল্যাণের জন্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখন স্বেচ্ছাসেবী অঙ্গনে দেখা যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্বার্থ। অনেকে সাহায্য করে কিন্তু তা করতে গিয়ে নিজের প্রচারকেই বেশি প্রাধান্য দেয়।”

‘অসুস্থ প্রতিযোগিতা নয়—সম্মিলিত উদ্যোগ’ প্রয়োজন

এ বিষয়ে সচেতন নাগরিকদের দাবি, রক্তদানের ক্ষেত্রে এমন প্রতিযোগিতা সার্বিকভাবে স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ধরনের মানসিকতায় তরুণরা আগ্রহ হারাতে পারে। আবু বকর সিদ্দিক-এর কথায়, “এই সংস্কৃতি এখনই বন্ধ করতে হবে। নয়তো আমরা নিজেরাই হারিয়ে ফেলব প্রকৃত মানবতার অর্থ।”

সমাজকর্মীরা বলছেন, সময় এসেছে স্বেচ্ছাসেবা এবং রক্তদানের ক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনার মূল চেতনা—স্বার্থহীন সেবা, মানবিকতা এবং সহমর্মিতা। কেবল ব্যক্তিগত লাভ বা প্রচারণায় নয়; বরং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো অনলাইনে প্রচুর কার্যক্রম পরিচালনা করে—যা ইতিবাচক। কিন্তু এর জেরে তৈরি হওয়া প্রচার প্রতিযোগিতা মূল সেবাকেই পেছনে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

শেষে তিনি আহ্বান জানান—স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মাঝে “সহযোগিতামূলক কাজ” বাড়ানোর জন্য, এবং সর্বোচ্চ ডোনার বা সক্রিয় সদস্যদের তালিকা প্রকাশ না করে বরং স্বল্প প্রচারে বেশি কার্যকর সেবা প্রদানের ওপর জোর দেয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর অভিমত—এতে স্বেচ্ছাসেবী মানুষরা প্রকৃত অর্থেই সমাজের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত হবেন।

Post a Comment

Previous Post Next Post