ভৈরবে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে সার-বীজ বিতরণ

জয়নাল আবেদীন রিটন, ভৈরব প্রতিনিধি

"সরিষা চাষ বাড়াবো, তেলের চাহিদা মেটাবো; সরিষা চাষে ভরবো, দেশ স্বনির্ভর হবে বাংলাদেশ"—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে রবি মৌসুমে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিনামূল্যে সার ও বীজ বিতরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রবিবার সকাল ১১টায় উপজেলা কৃষি অফিসের আয়োজনে উপজেলা পরিষদের বঙ্গবন্ধু হলে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ উদ্যোগের উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শবনম শারমিন। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মোট ৯৪০ জন কৃষক-কৃষাণী এ কর্মসূচির আওতায় বীজ ও সার পেয়েছেন।

কৃষকদের জন্য সরকারের সহায়তা

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, রবি মৌসুমের ফসল উৎপাদনে উৎসাহ দিতে গম, সরিষা, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম, পেঁয়াজ, মুগ ও মসুর ডালের বীজ বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিটি কৃষক পেয়েছেন এক কেজি করে বীজ এবং ১০ কেজি করে ডিএপি ও এমওপি সার। এ সুবিধা পেয়ে কৃষকেরা আগামী মৌসুমে আরও বেশি উৎপাদনে মনোযোগী হবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ইউএনও শবনম শারমিন বলেন, "প্রতিদিনের রান্নায় যে সয়াবিন তেল ব্যবহৃত হয়, তা একদিকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, অন্যদিকে আমদানি নির্ভর হওয়ায় দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ ফেলে। অথচ সরিষা তেল শুধু স্বাস্থ্যসম্মত নয়, বরং স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সরিষা চাষ বাড়াতে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে, যাতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তেলের ওপর আমাদের নির্ভরতা বাড়ে।"

তিনি আরও বলেন, "সরিষা তেল ব্যবহারে শুধু সাশ্রয় হয় না, বরং দেশের অর্থও সঞ্চয় হয়। সয়াবিন তেলের তুলনায় সরিষা তেল কমে বেশি কাজ দেয়, স্বাস্থ্যসম্মতও বটে। তাই এই প্রচারণা শুধু কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতেই নয়, স্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নেও সহায়ক হবে।"

বিশেষ অতিথিদের বক্তব্য

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মতিউর রহমান, যিনি বলেন, "২০২৫-২৬ অর্থবছরে রবি ফসল উৎপাদনে সরকার ব্যাপক ভর্তুকি দিচ্ছে। এই উদ্যোগের ফলে কৃষকেরা উৎপাদন ব্যয়ে সুবিধা পাবেন, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।"

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, "কৃষি হচ্ছে আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এ ধরনের প্রণোদনা সরকার নিয়মিত দিচ্ছে যাতে কৃষকেরা প্রণোদনা পেয়ে আরও বেশি উৎসাহে চাষাবাদে মনোযোগী হন।"

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান, যিনি সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়াও কৃষি অফিসের উপসহকারী কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং মাঠ পর্যায়ে কাজ করা কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

কৃষকদের প্রতিক্রিয়া

সার-বীজ পেয়ে সন্তুষ্ট কৃষক-কৃষাণীরা জানিয়েছেন, সরকার থেকে এ ধরনের সহায়তা তাদের উৎপাদনের ব্যয় অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে যেসব কৃষকের জমি ছোট—তাদের জন্য এ সুযোগ অত্যন্ত মূল্যবান। এতে তারা চাষাবাদে আগ্রহী হন এবং উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে পরিবার চালাতে সক্ষম হন।

ভৈরব উপজেলার কৃষক মো. আব্দুল কাদের বলেন, "প্রতিটি মৌসুমে সার ও বীজের খরচ নিয়ে চিন্তায় থাকি। সরকার থেকে বিনামূল্যে বীজ ও সার পাওয়ায় এবার ভালোভাবে সরিষা চাষ করতে পারব। আশা করি, ফলনও ভালো হবে।"

স্বনির্ভর কৃষির পথে এক ধাপ

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সরিষা চাষ বাড়ালে শুধু তেলের চাহিদাই মেটানো যাবে না, বরং দেশে তেলবীজ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের সম্ভাবনাও রয়েছে। ইউএনও শবনম শারমিনের বক্তব্য থেকে এও স্পষ্ট, সরকার চাইছে স্থানীয় পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে।

উল্লেখ্য, এ ধরনের কর্মসূচি শুধু ভৈরবেই নয়, দেশের বিভিন্ন উপজেলায় বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর ফলে কৃষির উৎপাদনশীলতা এবং কৃষকের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post